জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবিতে শুক্রবার
ছবি সংগৃহীত: ফাইল ছবি
অনলাইন ডেস্ক : জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবিতে শুক্রবার ইতালিজুড়ে বিক্ষোভ করেছেন হাজার হাজার শ্রমিক ও শিক্ষার্থী। তবে তাদের এই বিশাল বিক্ষোভ কর্মসূচিটি ছিল মূলত শান্তিপূর্ণ।
ফ্রান্স ও স্পেনের আন্দোলনের প্রভাবে ইতালিতে সম্প্রতি যে ধারাবাহিক বিক্ষোভ শুরু হয়েছে, শুক্রবারের বিক্ষোভটি ছিল অতীতের বিক্ষোভগুলোর তুলনায় সবচেয়ে বড়। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে আয়োজিত এই আন্দোলনে বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন স্থানে তাঁবু খাটিয়ে ক্যাম্প তৈরি করেছে এবং নিজেদের দাবি তুলে ধরতে স্কুল ভবনগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।
শিক্ষার্থীদের ডাকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনকে সমর্থন জানিতে তাতে যোগ দিয়েছেন শ্রমিক, শ্রমজীবী এবং সীমিত আয়ের লোকজনও। ইতালির ট্রেড ইউনিয়ন ইউএসবি’র ডাকা সাধারণ ধর্মঘটের অংশ হিসেবে শুক্রবারের বিক্ষোভে হাজার হাজার শ্রমিক ও শ্রমজীবী অংশ নেন। বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ট্রাক চালক, ট্যাক্সি চালক এবং কৃষকরাও ছিলেন। জ্বালানির মূল্য হ্রাস ও সামরিক খাতে ব্যয় কমানোর দাবিতে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই আন্দোলন করছেন তারা।
ইউএসবি ইউনিয়নের হিসেব অনুযায়ী, শুক্রবার পুরো ইতালি জুড়ে ১০ থেকে ১৫ লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। তবে কর্তৃপক্ষ এখনও এ সংক্রান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি।
রাজধানী রোমের বাসিন্দা ও শিক্ষার্থী সোফিয়া কাতালদি জানান, তার হাইস্কুলের পরিবেশ মোটেও নিরাপদ নয়। ১৬ বছর বয়সী সোফিয়া এএফপি-কে বলেন, “আমরা চাই না যে স্কুলের জানালা ভেঙে আমাদের মাথার ওপর পড়ুক, কিংবা স্কুলে ইঁদুরের উপদ্রব থাকুক। আমরা পরিচ্ছন্ন ভবন চাই। আমি বর্তমানের চেয়ে আরও ভালো একটি পৃথিবীতে বাঁচতে চাই।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বিয়েত্রিচে চিলেল্লি বলেছেন, শিক্ষার্থীরা এখন ‘সহ্যের শেষ সীমায়’ পৌঁছে গেছে। ২১ বছর বয়সী এই শিক্ষার্থী এএফপিকে বলেন, “অধিকাংশ শিক্ষার্থীর অতিরিক্ত টিউশন ফি এবং বাড়িভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য নেই। তাদের শিক্ষা ও আবাসন ব্যয় মেটাতে মা-বাবা ও অভিভাবকদের নাভিশ্বাস উঠছে।”
উদাহারণ হিসেবে তিনি বিয়েত্রিচে বলেন, রোমে বর্তমানে একটি ছোটো কক্ষের ভাড়া বর্তমানে মাসে ১ হাজার ২০০ ইউরো (বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ লাখ ৬৬ হাজার ২৬৯ টাকা) পৌঁছেছে।
রোমে আয়োজিত এই শোভাযাত্রার শুরুতে ছিল দুটি ট্রাক্টর ও একটি ট্যাক্সি। শহরের প্রধান রেল স্টেশন থেকে শুরু হওয়া এই মিছিলটি কলোসিয়াম ও অর্থনীতি মন্ত্রণালয়ের ভবনের পাশ দিয়ে এগিয়ে যায়। এ সময় বিক্ষোভকারীরা পতাকা নাড়ছিলেন এবং মেগাফোনে স্লোগান দিচ্ছিলেন।
বিক্ষোভকারীদের একটি দল স্লোগান দেয়, “আমাদের বোমা নয়, আরও বেশি ঘরবাড়ি প্রয়োজন!”
'এটা আমাদের ভবিষ্যৎ পুনরুদ্ধার করের প্রচেষ্টা’
ইতালির বাণিজ্যিক রাজধানী নামে পরিচিত মিলানের বিক্ষোভটিও কেন্দ্রীয় রেল স্টেশন থেকে শুরু হয়েছিল, তবে পরে তা শহরের বাইরের দিকে এগিয়ে যায়—শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে অনেক দূরে। দুই সপ্তাহ আগে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে আয়োজিত একটি স্বতস্ফূর্ত বিক্ষোভের সময় এই মিলান শহরেই বিক্ষোভকারীদের একাংশ ভাঙচুর দোকানপাট লুট, সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তির ক্ষতিসাধন করেছিল এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছিল।
মিলানে শিক্ষার্থীদের বহন করা একটি ব্যানারে লেখা ছিল, “আসুন, আমাদের ভবিষ্যৎ পুনরুদ্ধার করি।”
মিলানের এই ভিড়ে ছিলেন ২৫ বছর বয়সী স্তেফানো দে ফিনিস। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, এই বিভিন্ন বিক্ষোভ হয়তো দীর্ঘস্থায়ী কোনো পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, “আগামী বছর নির্বাচন হবে; কিন্তু সত্যি বলতে, নির্বাচনের পর নতুন সরকার প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য আন্তরিক হবে কি না— আমাদের জানা নেই।”
ইতালির বয়োজ্যেষ্ঠ ইউনিয়ন কর্মীদের রাজনৈতিক শক্তির কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “সমস্যা হলো, ইতালিতে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি, আর তরুণদের সংখ্যা কম। তাই আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যেন বয়স্করাও আন্দোলনে যুক্ত হন... তা না হলে এই লড়াইয়ে আমরা একা হয়ে পড়ব।”
সারা দেশজুড়ে বিভিন্ন বিক্ষোভস্থলের আশেপাশে দাঙ্গা দমনে সজ্জিত পুলিশ সদস্যদের দেখা গেছে।
তুরিনে ঘটা হাতেগোনা কয়েকটি সংঘর্ষের একটিতে, পুলিশ লাঠিপেটা করে বিক্ষোভকারীদের পিছু হটতে বাধ্য করে। এছাড়া প্রিফেকচার (প্রশাসনিক ভবন) থেকে বিক্ষোভকারীদের দূরে রাখতে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করেছে।
রোমে এএফপি’র সাংবাদিকরা দেখেছেন যে, বিক্ষোভের শেষ পর্যায়ে তরুণ বিক্ষোভকারীরা বোতল ছুড়ে মারছে, ডাস্টবিন উল্টে ফেলছে এবং একটি ডাস্টবিনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।
১৭-১৮ অক্টোবরের সপ্তাহান্তে মিলানে তরুণদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনার পর, মেলোনির কট্টর ডানপন্থী সরকার জনসমাবেশ সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করেছে এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের আটকের নিয়মগুলোকে শিথিল করেছে।
এছাড়া গত সপ্তাহে সরকার ট্রাক চালক, কৃষক এবং জেলেদের জন্য ১৭ কোটি ৫২ লাখ ইউরো’র একটি সহায়তা প্যাকেজের অনুমোদন দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানির মূল্য অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন।
শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবদের জন্যই আগামী ২০২৭ সালের বাজেটে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা নিয়েয়ে সরকার। এসব পরিকল্পনার মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষনীয়টি হলো—৩০ বছরের কম বয়সী কর্মীদের জন্য বছরে ২,৫০০ ইউরোর বোনাস।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “আমি আশা করি, এটি সামগ্রিকভাবে সেইসব তরুণ-তরুণীর প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে... যারা মনে করেন যে রাষ্ট্র তাদের বিষয়ে উদাসীন। তবে এসব পরিকল্পনা তাদের জন্য নয়, যারা জানালা-দরজা ভাঙচুর করে।"
সূত্র : এএফপি, এনডিটিভি