যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতিতে চীনা পণ্যের জন্য মার্কিন বাজার সংকুচিত হওয়ায় বিকল্প
ছবি সংগৃহীত: ফাইল ছবি
অনলাইন ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতিতে চীনা পণ্যের জন্য মার্কিন বাজার সংকুচিত হওয়ায় বিকল্প বাজার হিসেবে ইউরোপের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে বেইজিংয়ের। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। একসময় পারস্পরিক নির্ভরশীলতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা দুই পক্ষের সম্পর্কে এখন অবিশ্বাস, বিরোধ ও প্রতিযোগিতা বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গত এক বছরে ইউরোপ-চীন বাণিজ্য সম্পর্কে বড় পরিবর্তন এসেছে। প্রভাবশালী মার্কিন দ্বিমাসিক সংবাদমাধ্যম দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের বাণিজ্যে উভয়েই লাভবান হয়েছে। চীনের ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের কাছে ইউরোপীয় পণ্যের চাহিদা ছিল ব্যাপক। অন্যদিকে ইউরোপের ক্রেতারা তুলনামূলক কম দামে চীনা পণ্য পেয়েছেন। চীনের সঙ্গে বাণিজ্যে ইউরোপের ঘাটতি থাকলেও তা নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই ছিল।
চীনের রপ্তানিকারকদের ভর্তুকি দেওয়া ও অন্যান্য বাণিজ্যিক অনিয়ম নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলো আপত্তি তুললেও যুক্তরাষ্ট্রের মতো কঠোর হয়নি। চীনে লাভজনক ব্যবসা করা ইউরোপীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করতে চায়নি। কিন্তু কয়েকটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণে সেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে।
এর অন্যতম কারণ চীনের ‘মেড ইন চায়না ২০২৫’ কর্মসূচি। এর আওতায় দেশটির উৎপাদনশিল্পে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও পণ্যের মান বেড়েছে। ফলে চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারেই ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নেমেছে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো। একই কর্মসূচির ফলে উৎপাদন সক্ষমতা অভ্যন্তরীণ চাহিদা ছাড়িয়ে যাওয়ায় বাড়তি পণ্য বিক্রিতে বিদেশি বাজারের ওপর নির্ভরতাও বেড়েছে।
এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেনের প্রশাসনের সময় চীনা পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর বাণিজ্যনীতি দেশটির মার্কিন বাজারে প্রবেশ সীমিত করেছে। এর প্রভাব পড়েছে ইউরোপের বিলাসপণ্য ও উন্নত যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারকদের ব্যবসায়। চীনে একসময় দ্রুত বিক্রি বাড়ানো ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতারাও এখন প্রতিযোগিতার মুখে।
২০০৩ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে চীনে মার্সিডিজের বিক্রি বছরে গড়ে ২৪ শতাংশ, বিএমডব্লিউর ২০ দশমিক ২ শতাংশ এবং অডির ১২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে সেই প্রবৃদ্ধি কমেছে। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে চীনে মার্সিডিজের বিক্রি আগের বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশ কমে যায়। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত ১২ মাসে বিএমডব্লিউর বিক্রি কমেছে ২৫ শতাংশ।
একই সময়ে ইউরোপে চীনা পণ্যের আমদানি বেড়েছে। ২০২৫ সালে চীন থেকে ইইউর আমদানি বৃদ্ধি পায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ১২ মাসে তা আরও ৮ শতাংশ বাড়ে। এর ফলে চীনের সঙ্গে ইইউর বাণিজ্য ঘাটতি ২০২৪ সালের প্রথম প্রান্তিকের ৬৬ বিলিয়ন ইউরো থেকে চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বেড়ে ১০৩ বিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়ায়।
এ পরিস্থিতিতে ফ্রান্স ও জার্মানিসহ ইউরোপের দেশগুলো চীনের বাণিজ্যনীতির বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন লাগার্দ সতর্ক করেছেন, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ইউরোপের অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি মধ্যম প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনশিল্পকে দুর্বল করে দিতে পারে।
তবে বেইজিংয়ের ওপর চাপ তৈরিতে এবার সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে ইউরোপ। চীনা বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ি আমদানিতে শুল্ক আরোপের পর ইউরোপে এসব গাড়ি রপ্তানি বছরে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৫০ হাজারে সীমিত রাখতে সম্মত হয়েছে বেইজিং। পরবর্তী সময়ে রপ্তানি বার্ষিক ৬ শতাংশ হারে বাড়ানোর বিষয়েও সম্মতি দিয়েছে দেশটি। রাসায়নিক পণ্যের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সীমা আরোপ নিয়ে আলোচনা চলছে।
প্যারিসভিত্তিক জ্যাক দেলোর ইনস্টিটিউটের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাবিষয়ক পরিচালক এলভির ফ্যাব্রির মতে, ইউরোপের সামনে তৈরি হওয়া সুযোগ দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তবে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির কারণে চীনের বিকল্প বাজার সীমিত হয়ে পড়ায় এ মুহূর্তে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে ইইউ। ফলে বেইজিংয়ের ওপর ওয়াশিংটনের শুল্কনীতির অনাকাঙ্ক্ষিত কৌশলগত সুবিধা পাচ্ছে ইউরোপ।