ই-পেপার

চীনের অর্থনীতির রূপকার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজির মৃত্যু

চীনের আধুনিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রধান স্থপতি

আপডেট: ১২ আগস্ট ২০২৬, ২০:১০
১৯ ভিউ
চীনের অর্থনীতির রূপকার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজির মৃত্যু

ছবি সংগৃহীত: ফাইল ছবি

অনলাইন ডেস্ক : চীনের আধুনিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রধান স্থপতি এবং দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজি মারা গেছেন।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বুধবার (১২ আগস্ট) বেইজিংয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯৭ বছর বয়সে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত চীনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ঝু রংজি কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন এক অর্থনৈতিক জাদুকর। আধুনিক বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চীন আজ যে পরাশক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান সুসংহত করেছে, তার মজবুত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল মূলত এই দূরদর্শী নেতার হাত ধরেই।

তার সময়ে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন, সংবেদনশীল এবং যুগান্তকারী সব সংস্কার সিদ্ধান্তই আজকের চীনকে বিশ্বমঞ্চের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির মুকুট এনে দিয়েছে।

ঝু রংজির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল আপসহীন সাহসিকতা এবং বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণ। নব্বইয়ের দশকে উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেই তিনি চীনের ধাবমান মূল্যস্ফীতিকে সফলভাবে টেনে ধরে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছিলেন।

এরপর ১৯৯৮ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে তিনি এমন কিছু সংস্কার কাজে হাত দেন। দেশটির অদক্ষ, স্থবির এবং লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেসরকারিকরণ ও আধুনিকায়নের সিদ্ধান্ত নেন ঝু। তার এই কঠোর সিদ্ধান্তে কারণে প্রায় চার কোটি রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা ও কর্মচারী চাকরি হারিয়েছিলেন, যা তৎকালীন সময়ে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই সাহসী পদক্ষেপই চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারকে চাঙ্গা করে তোলে এবং অর্থনীতিতে অভূতপূর্ব গতিশীলতা আনে।রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

অন্যদিকে একই সময়ে তিনি চীনের আবাসন খাতে এক বিশাল বিপ্লব ঘটান। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আবাসন সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রির ঐতিহাসিক উদ্যোগ নেন তিনি, যা দেশটিতে ব্যক্তিগত আবাসন খাতের দ্রুত বিকাশ নিশ্চিত করে।

তবে ঝু রংজির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় এবং ঐতিহাসিক মাইলফলক ছিল ২০০১ সালের ডিসেম্বরে চীনকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) অন্তর্ভুক্ত করা। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর নানামুখী শর্ত ও বাধা উপেক্ষা করে, অত্যন্ত চতুর ও দূরদর্শী আলোচনার মাধ্যমে তিনি চীনকে বিশ্ববাজারের উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার এনে দেন। এই একটি সিদ্ধান্তই পরবর্তী দুই দশকে চীনকে বিশ্বের প্রধান উৎপাদনকারী দেশ বা ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’-এ পরিণত করে।

ঝু রংজির তৈরি করা সেই মজবুত অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর ভর করেই ২০১০ সালে চীন জাপানকে ছাড়িয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

এদিকে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ঝু ছিলেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক মূর্তিমান আতঙ্ক। দুর্নীতিগ্রস্ত আমলা ও কর্মকর্তাদের জন্য তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর, যার কারণে তাকে আড়ালে ‘বস’ বা ‘পাগলা ঝু’ নামেও ডাকা হতো। তবে তার এই কঠোরতার পেছনে ছিল দেশের প্রতি গভীর দেশপ্রেম ও সততা।

স্পষ্টভাষী, কঠোর কর্মপদ্ধতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি সমাদৃত ছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার তাকে ‘তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার অধিকারী’ এবং আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম সেরা অর্থনৈতিক সংস্কারক হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর চীনের অর্থনীতির এই রূপকার জনসম্মুখে আর খুব বেশি দেখা যায়নি। এবার তার প্রয়াণের মাধ্যমে চীনের অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি গৌরবময় অধ্যায়ের অবসান ঘটল। কিন্তু তার রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক নীতি এবং আধুনিক চীনের প্রতিটি অবকাঠামোয় তার অবদান চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

সূত্র: এপি