ই-পেপার

যুক্তরাষ্ট্রে নতুন যুগের সূচনা, ধর্মীয় মেরুকরণের মধ্যে ইতিহাস গড়ছেন মুসলিম প্রার্থীরা!

যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় একজন মুসলিম

আপডেট: ১২ আগস্ট ২০২৬, ২০:৩৪
১৭ ভিউ
যুক্তরাষ্ট্রে নতুন যুগের সূচনা, ধর্মীয় মেরুকরণের মধ্যে ইতিহাস গড়ছেন মুসলিম প্রার্থীরা!

ছবি সংগৃহীত: ফাইল ছবি

অনলাইন ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় একজন মুসলিম প্রার্থীর জন্য ‘আনুগত্য পরীক্ষা’ বা রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করা সবসময়ই এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে ইসরায়েলের নীতি ও গাজায় চলমান সংঘাত নিয়ে খোলামেলা সমালোচনা করলে সে চ্যালেঞ্জ রূপ নেয় পাহাড়সম বাধার। তবে সেই বাঁধ ভেঙে অভূতপূর্ব ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি ইলহান ওমর ও মিশরীয়-বংশোদ্ভূত মার্কিন চিকিৎসক ও ডেট্রয়েটের সাবেক স্বাস্থ্য পরিচালক ড. আব্দুল এল-সায়েদ।

যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান দল আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ধর্মীয় মেরুকরণ ও মুসলিমবিদ্বেষের বিষবাষ্প ছড়িয়ে যাচ্ছেন। গতকাল মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রার্থীদের সরাসরি ‘জিহাদি’ বলে অভিহিত করেন। মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে মিশরীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম প্রার্থী আব্দুল এল-সায়েদের জয়ের পরপরই ট্রাম্পের এই আক্রমণাত্মক বক্তব্য সামনে আসে।

যদিও ওভাল অফিসে কথা বলার সময় ট্রাম্প কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীর নাম উল্লেখ করেননি, তবে পরবর্তীতে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ আব্দুল এল-সায়েদকে লক্ষ্য করে একাধিক পোস্ট করেন। একটি পোস্টে ট্রাম্প এল-সায়েদের ছবি শেয়ার করেন, যেখানে হিজাব পরিহিত দুজন নারীও ছিলেন। ছবির ক্যাপশনে ট্রাম্প দাবি করেন, এই প্রার্থীরা সাধারণ আমেরিকানদের ঘরবাড়ি ও সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করছেন।

এর আগেও ট্রাম্প ওই ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে ইহুদিবিদ্বেষী উল্লেখ করে দাবি করেছিলেন যে, এল-সায়েদের রাজনৈতিক উত্থান দেশে 'অপরাধ, ধ্বংস এবং লজ্জা' নিয়ে আসবে। পাশাপাশি সোমালি বংশোদ্ভূত আমেরিকানদের নিয়েও আপত্তিকর মন্তব্য করেন সাবেক এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

কেবল ট্রাম্পই নন, অন্যান্য অনেক রিপাবলিকান নেতাও একই ধরণের সুর চড়িয়েছেন। সাউথ ক্যারোলিনার প্রতিনিধি ন্যান্সি মেস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, "আমেরিকার সরকারি পদে থাকা প্রতিটি মুসলিম আসলে একেকটি ট্রোজান হর্স এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।" অন্যদিকে আলাবামার সেনেটর টমি টুবারভিল এল-সায়েদকে সরাসরি 'সন্ত্রাসী' ও 'র‍্যাডিকাল ইসলামপন্থী' বলে আখ্যা দেন।

তবে বিদ্বেষকে জয় করে মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যে ভূমিধস জয় তুলে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বামপন্থী ও প্রগতিশীল শিবির। মিনেসোটার ৫ম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে বিপুল ব্যবধানে প্রাইমারি নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি ইলহান ওমর। মোট প্রদত্ত ভোটের ৮০ শতাংশেরও বেশি পেয়ে তিনি তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করেছেন।

২০১৯ সালে প্রথমবার মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে (হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস) নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন সোমালি বংশোদ্ভূত ও সাবেক শরণার্থী ইলহান ওমর। তিনি মার্কিন কংগ্রেসের প্রথম দুই মুসলিম নারী সদস্যের একজন এবং হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসের প্রথম সোমালি-আমেরিকান প্রতিনিধি। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রগতিশীল গোষ্ঠী বা ‘দ্য স্কোয়াড’-এর অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে পরিচিতি পান তিনি। অভিবাসন নীতি, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা এবং ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির তীব্র সমালোচক ও প্রগতিশীল অবস্থানের জন্য রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি বেশ আলোচিত ও প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর।

এই ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে ইলহান ওমর কেবল দলের ভেতরের প্রার্থিতাই সুনিশ্চিত করেননি, বরং মিনেসোটায় ডেমোক্র্যাটদের মূলধারার নীতিতে বামপন্থী প্রগতিশীল ধারার অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছেন। আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে এই জয় ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রগতিশীলদের বড় ধরনের রাজনৈতিক অক্সিজেন জোগাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।Politics

অন্যদিকে, গত ৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাইমারি নির্বাচনে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হ্যালি স্টিভেন্সকে হারিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন লাভ করেন ড. আব্দুল এল-সায়েদ। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়ার দৌড়ে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি।

এল-সায়েদকে হারাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাবশালী ইসরায়েলপন্থী লবিং গ্রুপ 'আইপ্যাক' (AIPAC) এবং তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো প্রায় ৩ কোটি (৩০ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার ব্যয় করে। পাশাপাশি হ্যালি স্টিভেন্সের পক্ষে বাইরে থেকে মোট খরচ করা হয়েছিল প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার। নির্বাচনের শেষ ৫ সপ্তাহে কেবল টেলিভিশন বিজ্ঞাপনেই স্টিভেন্সের পক্ষে ব্যয় করা হয়েছিল ২৬.৯ মিলিয়ন ডলার, যা এল-সায়েদের (২.১ মিলিয়ন ডলার) তুলনায় ১২ গুণেরও বেশি। তবে বিপুল অংকের অর্থ ও সর্বাত্মক প্রচারণা সত্ত্বেও মিশিগানের ডেমোক্র্যাট ভোটাররা এল-সায়েদের ওপরই আস্থা রেখেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) ইলহান ওমর, রাশিদা তলাইব কিংবা আন্দ্রে কার্সনের মতো মুসলিম আইনপ্রণেতারা থাকলেও ১০০ সদস্যের শক্তিশালী মার্কিন সিনেটে এখন পর্যন্ত কোনো মুসলিম প্রতিনিধিত্ব করেননি। সিনেটররা পুরো অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

৯/১১ পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম রাজনৈতিক নেতাদের প্রায়ই ‘আনুগত্য’ ও ‘নিরাপত্তা’র মাপকাঠিতে বিচার করা হতো। বিশেষ করে ফিলিস্তিনের পক্ষে এবং ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কথা বললে তাদের রাজনৈতিকভাবে একঘরে করার অপচেষ্টা চালানো হতো। গাজায় ইসরায়েলের পদক্ষেপকে সরাসরি ‘গণহত্যা’ আখ্যা দেওয়া এবং মার্কিন রাজনীতিতে আইপ্যাকের প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করা সত্ত্বেও ইলহান ওমর ও এল-সায়েদের বিজয় আমেরিকান রাজনীতিতে এক নতুন মোড় নির্দেশ করে।

আগামী নভেম্বরের চূড়ান্ত নির্বাচনে বিজয়ী হলে ড. আব্দুল এল-সায়েদ হবেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের প্রথম মুসলিম মার্কিন সিনেটর। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মুসলিম নেতৃত্বের প্রভাব ও প্রতিনিধিত্ব প্রতিনিয়ত শক্তিশালী হচ্ছে। মিশিগানের ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে ড. আবদুল এল-সায়েদের ঐতিহাসিক জয় এবং মার্কিন কংগ্রেসে মুসলিম নেতাদের অবস্থান সেই অগ্রযাত্রাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে।

সম্প্রতি 'মুসলিম গার্ল' প্ল্যাটফর্মে মার্কিন মুসলিম নেতাদের এক গোলটেবিল আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য রাশিদা তালাইব জানান, ২০১৯ সালে তিনি ও ইলহান ওমর কংগ্রেসে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত পুরো যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২০০ জন মুসলিম প্রতিনিধি বিভিন্ন পদে নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি বলেন, "এই অর্জন সাধারণ মানুষকে নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে না রেখে সগৌরবে তুলে ধরার সাহস জুগিয়েছে।"

কংগ্রেসউম্যান ইলহান ওমর অতীতের রাজনৈতিক পরিবেশের কথা উল্লেখ করে বলেন, আগে মুসলিম প্রার্থীদের নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় কিছুটা আড়ালে রাখার পরামর্শ দেওয়া হতো। কিন্তু এখন সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে। তরুণ প্রজন্মের মুসলিম প্রার্থীরা এখন নিজেদের আত্মপরিচয় বজায় রেখেও নির্বাচনে জয়ী হতে পারছেন।

ড. আবদুল এল-সায়েদ আলোচনার ইতি টেনে বলেন, "মুসলিম প্রার্থীরা যখন নতুন পথ তৈরি করেন, তা কেবল মুসলিমদের জন্যই নয়—বরং যেকোনো জাতিগত বা ধর্মীয় পরিচয়ের প্রার্থীর জন্য পথ সুগম করে। এটি প্রমাণ করে আমেরিকা কেবল নির্দিষ্ট কোনো একক কাঠামোর নয়।

আমেরিকান রাজনীতিতে মুসলিমদের এই ভূমিকা কেবল ক্ষমতায় বসার লড়াই নয়, বরং যাদের কণ্ঠস্বর চেপে রাখা হয়েছিল তাদের কথা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার এক নতুন অধ্যায়। সূত্র : মিডল ইস্ট মনিটর, ইউএ নিউজ, মুসলিম মিরর।