ই-পেপার

১৬ বছর পর যুক্তরাষ্ট্র একই দিনে ৩ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে যাচ্ছে

যুক্তরাষ্ট্রের তিন অঙ্গরাজ্য টেনেসি, অ্যালাবামা ও ওকলাহোমা

আপডেট: ১২ আগস্ট ২০২৬, ১৯:৪৪
১৮ ভিউ
১৬ বছর পর যুক্তরাষ্ট্র একই দিনে ৩ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে যাচ্ছে

ছবি সংগৃহীত: ফাইল ছবি

অনলাইন ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রের তিন অঙ্গরাজ্য টেনেসি, অ্যালাবামা ও ওকলাহোমা বৃহস্পতিবার তিন বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে যাচ্ছে। এমন হলে, ২০১০ সালের পর, প্রায় ১৬ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে একই দিনে তিনজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে।

যুক্তরাষ্ট্রে এখন শুধু অল্প কয়েকটি রাজ্যেই শুধু মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। বৃহস্পতিবার যে তিন রাজ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে, সেগুলোও এর মধ্যে রয়েছে। তিন রাজ্যেই প্রাণঘাতী ইনজেকশন দিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক রবিন মেহের বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র পাঁচ বা ছয়টি রাজ্য নিয়মিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করছে।

এর মধ্যে আরো কম রাজ্য নতুন করে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিচ্ছে।

তিনি বলেন, একই দিনে তিনজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া খুবই বিরল। এবার তিন রাজ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তারিখ একই হওয়ায় এমনটি ঘটতে যাচ্ছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ১১টি রাজ্যে মোট ৪৭ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

২০০৯ সালের পর এক বছরে এটিই ছিল সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা। সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে ফ্লোরিডায়। সেখানে ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। আলাবামা, সাউথ ক্যারোলাইনা ও টেক্সাসে পাঁচজন করে এবং টেনেসিতে তিনজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।

এ ছাড়া ওকলাহোমা, মিসিসিপি, অ্যারিজোনা ও ইন্ডিয়ানায় দুজন করে এবং লুইজিয়ানা ও মিসৌরিতে একজন করে বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। চারটি রাজ্যে এসব মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এর মধ্যে ফ্লোরিডায় জুলাই মাসে একই দিনে দুজন বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে সর্বশেষ একই দিনে তিনজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল ২০১০ সালের ৭ জানুয়ারি। সেদিন লুইজিয়ানা, ওহাইও ও টেক্সাসে একজন করে বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

২০১৮ সালেও একই দিনে তিনজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু টেক্সাসের এক বন্দি ক্ষমা পাওয়ায় এবং অ্যালাবামার কারা কর্মকর্তারা আইভি লাইন বসাতে সমস্যায় পড়ায় শেষ পর্যন্ত সেদিন মাত্র একজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।

প্রাণঘাতী ইনজেকশন

টেনেসি তিন মাস পর অ্যান্থনি ড্যারেল হাইন্সের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পরিকল্পনা করছে। এর আগে আরেক বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সময় শরীরে আইভি লাইন বসাতে সমস্যা হওয়ায় সেই প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়েছিল। ওই ঘটনার পর প্রাণঘাতী ইনজেকশনের সময় আইভি লাইন বসানো নিয়ে বিভিন্ন রাজ্যের সমস্যাগুলো আবারও আলোচনায় এসেছে।

রবিন মেহের বলেন, ‘যে সমস্যা ঘটেছিল, তার কারণে এই মুহূর্তে সবার নজর টেনেসির দিকে।’ মে মাসে টনি কারুথার্সের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা করা হয়। চিকিৎসক দল শুরুতেই তার শরীরে একটি আইভি লাইন বসাতে সক্ষম হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় দ্বিতীয় একটি আইভি লাইন বসাতে তারা এক ঘণ্টারও বেশি সময় চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রক্রিয়া বাতিল করা হয় এবং কারুথার্সকে এক বছরের জন্য মৃত্যুদণ্ড থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

৬৬ বছর বয়সী হাইন্স আগের ওই ঘটনার সমস্যাগুলোকে নিজের পক্ষে ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেছেন, তার শারীরিক সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে দুটি স্ট্রোকের কারণে তার শরীরের একাংশ অবশ হয়ে গেছে। এসব কারণে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময়ও আইভি লাইন বসাতে সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা বেশি।

হাইন্স গভর্নর ও আদালতের কাছে মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করার আবেদন করেছিলেন। তবে তার আবেদন সফল হয়নি। তিনি দাবি করেছেন, আগের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক এ ধরনের কাজের জন্য যোগ্য নন এবং তার ক্ষেত্রেও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে সমস্যা হতে পারে।

গভর্নর বিল লি হাইন্সের আবেদনের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে রাজি হননি। গত সপ্তাহে টেনেসি সুপ্রিম কোর্টও তার মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করার আবেদন নাকচ করে দেয়। হাইন্সের আসন্ন মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় আগের একই চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করবেন কি না, তা টেনেসি কর্তৃপক্ষ জানায়নি। তবে আদালত বলেছে, ওই চিকিৎসক অযোগ্য, এমন প্রমাণ হাইন্স দিতে পারেননি।

১৯৮৫ সালে ক্যাথরিন জিন জেনকিনসকে ছুরিকাঘাতে হত্যার দায়ে হাইন্স দোষী সাব্যস্ত হন। তখন ৫৪ বছর বয়সী জেনকিনস কিংস্টন স্প্রিংসের একটি মোটেলে কাজ করতেন। ১৯৮৬ সালে হাইন্সকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পরে আপিলের মাধ্যমে তিনি নতুন করে সাজা নির্ধারণের সুযোগ পান। তবে ১৯৮৯ সালে আবারও তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

২০২১ সালে জর্জিয়ায় ৫ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে ৪২ বছর বয়সী জেরেমি উইলিয়ামসের মৃত্যুদণ্ড আলাবামায় কার্যকর করার কথা রয়েছে। কামারি হল্যান্ডকে হত্যার কথা স্বীকার করা উইলিয়ামস নিজেই তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আবেদন করেছেন।

প্রসিকিউটররা জানান, শিশুটিকে যৌন নির্যাতনের বিনিময়ে তার মাকে ২ হাজার ৫০০ ডলার দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন উইলিয়ামস। পরে তিনি শিশুটিকে ধর্ষণ ও শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন।

প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, উইলিয়ামস তার ওপর হামলার ভিডিও ধারণ করেন এবং নির্যাতন চালিয়ে যাওয়ার জন্য শিশুটির মরদেহ সেখানে রেখে দেন। ২০২২ সালে আলাস্কায় ২০০৫ সালে নিজের শিশুকন্যাকে হত্যার অভিযোগেও উইলিয়ামসের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।

রাসেল কাউন্টির ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি রিচার্ড চ্যান্সি বলেন, ‘এই ব্যক্তি শিশুদের জীবনে ধ্বংসের চিহ্ন রেখে গেছে।’

ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের প্রায় ১০ শতাংশকে ‘স্বেচ্ছাসেবী’ বলা হয়। তারা নিজেদের আপিল প্রত্যাহার করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পথ সহজ করে দেন। তবে বেশিরভাগ বন্দিকে দীর্ঘ সময় মৃত্যুদণ্ডের তালিকায় থাকতে হয়।

ওকলাহোমা

২০০৩ সালে প্রেমিকা অলিম্পিয়া ফিশারকে হত্যার দায়ে ৭০ বছর বয়সী কার্লোস কুয়েস্তা-রদ্রিগেজের মৃত্যুদণ্ড ওকলাহোমায় কার্যকর করার কথা রয়েছে। প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে তিনি হবেন ২০২৬ সালে ওকলাহোমায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া তৃতীয় ব্যক্তি।

প্রসিকিউটররা জানান, ৪৩ বছর বয়সী ফিশার কুয়েস্তা-রদ্রিগেজের এক চোখে গুলি করেন। পরে ফিশার সাহায্যের জন্য চিৎকার শুরুর প্রায় আট মিনিট পর তার অন্য চোখে গুলি করে তাকে হত্যা করেন।

গত মাসে ওকলাহোমার ক্ষমা ও প্যারোল বোর্ড ৩-১ ভোটে কুয়েস্তা-রদ্রিগেজের ক্ষমার সুপারিশ না করার সিদ্ধান্ত নেয়। তার আইনজীবীরা বোর্ডের কাছে তাকে প্যারোল ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার সুপারিশ করার আবেদন করেছিলেন।

তারা জানান, কুয়েস্তা-রদ্রিগেজের শৈশব ছিল কঠিন। এ ছাড়া তিনি মস্তিষ্কের ক্ষতি, পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি), সাইকোটিক এপিসোড এবং গুরুতর বিষণ্ণতায় ভুগছিলেন।

তবে কুয়েস্তা-রদ্রিগেজ নিজেই বোর্ডকে জানান, তিনি ক্ষমা চান না। তিনি বলেন, ফিশারের দুই মেয়ে যেন জানতে পারে, তাদের মায়ের সঙ্গে যা ঘটেছে তার জন্য তিনি অনুতপ্ত। স্প্যানিশ ভাষায় একজন অনুবাদকের মাধ্যমে তিনি বলেন, ‘এত ভয়াবহ কিছু করার মতো সুস্থ মানসিক অবস্থায় আমি থাকতে পারি না। এই পুরো ঘটনার কোনো অর্থ আমি খুঁজে পাইনি।’