ই-পেপার

মার্কিন রাষ্ট্রদূতের যোগদান আটকে রেখেছে ব্রাজিল, চরম ক্ষুব্ধ ওয়াশিংটন

ব্রাজিলে নিযুক্ত মার্কিন নতুন রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব নেওয়ার

আপডেট: ৩০ জুলাই ২০২৬, ২১:২৯
১৮ ভিউ
মার্কিন রাষ্ট্রদূতের যোগদান আটকে রেখেছে ব্রাজিল, চরম ক্ষুব্ধ ওয়াশিংটন

ছবি সংগৃহীত: ফাইল ছবি

অনলাইন ডেস্ক : ব্রাজিলে নিযুক্ত মার্কিন নতুন রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক অনুমোদন আটকে রেখেছে ব্রাজিলের সরকার। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এই সিদ্ধান্তহীনতায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। এ নিয়ে সৃষ্ট টানাপোড়েনে পশ্চিমের বৃহত্তম দুই গণতান্ত্রিক দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ফাটল আরও গভীর হয়েছে।

বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আগামী অক্টোবরে ব্রাজিলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই বিরোধের কারণে নির্বাচনের আগে ব্রাসিলিয়ায় হয়তো ওয়াশিংটনের কোনো রাষ্ট্রদূত থাকবে না। ফলে দুই দেশের বাণিজ্য প্রবাহে এর প্রভাব আগেই পড়েছে এবং এতে পরস্পরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগও উঠেছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধি ড্যানিয়েল পেরেজকে গত ১ জুন ব্রাজিলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে মনোনীত করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই বিষয়ে অবগত অন্তত চার ব্যক্তি বলেছেন, ব্রাজিলের সম্মতি পাওয়ার আগেই পেরেজকে মনোনীত করা হয়; যা ‘আগ্রেমো’ নামে পরিচিত একটি প্রচলিত কূটনৈতিক শিষ্টাচার।

ব্রাসিলিয়ার একাধিক কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, এই শিষ্টাচার লঙ্ঘন বা সম্মতি না নেওয়াকে অবমাননাকর মনে করছে ব্রাজিল সরকার। গত সপ্তাহে কমিটির অনুমোদন পাওয়ার পর পেরাজের মনোনয়ন এখন সিনেটে চূড়ান্ত ভোটাভুটির অপেক্ষায় রয়েছে। তবে ব্রাজিলের আনুষ্ঠানিক অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত তিনি পদে যোগ দিতে পারছেন না।

মার্কিন দুটি সূত্র বলেছে, বিষয়টি নিয়ে ব্রাজিলের এই ধীরগতির নীতিকে মার্কিন কর্মকর্তারা ইতিবাচকভাবে নিচ্ছেন না এবং সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা এটি নিয়ে চরম ক্ষুব্ধ হয়েছেন। চলতি সপ্তাহের মাঝে এই সমস্যার কোনো সমাধান না হলে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন ব্রাজিলের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে বলেও একটি সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে।

ব্রাজিলের বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুই ইনাসিও লুলা দ্য সিলভার প্রশাসনের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিওর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সম্পর্ক বহু দিন ধরেই উত্তপ্ত। লাতিন আমেরিকার রাজনীতিকে রক্ষণশীলদের পক্ষে প্রভাবিত করার মার্কিন চেষ্টার অভিযোগ এনেছে লুলার প্রশাসন।

অন্যদিকে, মার্কিন ট্রাম্প প্রশাসন উল্টো অভিযোগ করে বলছে, ব্রাজিলের বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়ায় রক্ষণশীলদের সেন্সর করা হচ্ছে বা তাদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে।

পেরাজের আগ্রেমো গ্রহণে ব্রাজিলের বিলম্বের বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন মুখপাত্র বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ও স্বার্থ রক্ষায় বিশ্বে কারা প্রতিনিধিত্ব করবেন তা নির্ধারণ করার অধিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রয়েছে। সিনেটের পরামর্শ ও সম্মতির ভিত্তিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার প্রশাসনের জন্য আমেরিকা ফার্স্ট ভাবধারার একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক দল গঠন করছেন। আমাদের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ায় বিদেশি কোনো রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের যেকোনো চেষ্টা আমরা প্রত্যাখ্যান করি।

ব্রাজিলের দুই কর্মকর্তা বলেছেন, কূটনৈতিক নিয়ম মেনেই পেরাজের বিষয়টিতে বর্তমানে তদন্ত পরিচালনা করছে ব্রাজিল সরকার। ওই দুই কর্মকর্তার একজন বলেছেন, আগামী ৪ অক্টোবরের নির্বাচনের আগে পেরাজ হয়তো এই আগ্রেমো অনুমোদন পাবেন না।

‘‘আমরা কিন্তু বলছি না যে আগ্রেমো দেওয়া হবে না, তবে এর কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। উপযুক্ত সময় কখন আসবে, তা নির্ধারণের পুরো এখতিয়ার কেবল স্বাগতিক দেশেরই।’’

এ বিষয়ে ব্রাজিলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ভিয়েনা কনভেনশন বা কূটনীতির আন্তর্জাতিক নীতি অনুযায়ী এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ গোপনীয়তার অন্তর্ভুক্ত। তাই আমরা এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করব না। অন্যদিকে, পেরাজের ফ্লোরিডার কার্যালয়ে ই-মেইল পাঠানো হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

• সম্পর্কে উত্তাপ ও জটিল নির্বাচন

আগামী অক্টোবরের নির্বাচনে লুই ইনাসিও লুলা দ্য সিলভা নিজের চতুর্থ মেয়াদের জয়ের জন্য লড়াই করছেন। এবার তার অন্যতম মূল স্লোগান হয়ে উঠেছে ‘জাতীয় সার্বভৌমত্ব’। নির্বাচনে লুলার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো; যিনি ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে এবং ট্রাম্পকে নিজের প্রধান মিত্র হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

ব্রাজিল সরকারের বিরোধিতা সত্ত্বেও গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ব্রাজিলের দুটি সংগঠিত অপরাধী গোষ্ঠীকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে।

পাশাপাশি, অসাধু বাণিজ্য নীতির অভিযোগ তুলে চলতি মাসে ব্রাজিলের বেশ কিছু পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে ওয়াশিংটন। এরপর গত সপ্তাহে জোরপূর্বক শ্রমের উদ্বেগের কথা জানিয়ে আরও ১২ দশমিক ৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক চাপিয়ে দিয়েছে মার্কিন অর্থ দপ্তর।

এর কয়েক দিন পরই রয়টার্সকে ব্রাজিলের দুই কর্মকর্তা বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের দুই কর্মকর্তা ব্রাজিলের নির্বাচনী ব্যবস্থার সততা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করতে দেশটিতে ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে তাদের ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে ব্রাজিল সরকার।

সাম্প্রতিক বেশ কিছু জরিপে দেখা গেছে, লুলা দ্য সিলভা তার প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোর চেয়ে সামান্য হলেও সুনির্দিষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে আছেন।

চলতি মাসে কমিটির শুনানিতে পেরাজ সিনেটরদের উদ্দেশে বলেন, তিনি অনুমোদন পেলে ব্রাজিলের আগামী অক্টোবরের নির্বাচনই হবে তার প্রথম অগ্রাধিকার। দুই দেশের বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্রাজিলে যেন একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ বজায় থাকে, সেই লক্ষ্যেই কাজ করবে যুক্তরাষ্ট্র।

জ্বালানি ও কৃষি খাতের বৈষম্যের বিষয়ে পেরাজ বলেন, ব্রাজিলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত নিশ্চয়ই রয়েছে। কিন্তু এখনো কিছু শিল্পখাতে দুই দেশের মাঝে বড় রকমের বৈষম্য বিদ্যমান।

সূত্র: রয়টার্স।