আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগে প্রকাশিত সরকারি
ছবি সংগৃহীত: ফাইল ছবি
অনলাইন ডেস্ক : আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগে প্রকাশিত সরকারি তথ্যে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতি বা মূল্যস্ফীতির হার প্রত্যাশার চেয়েও বেশি বেড়েছে। আগস্ট পর্যন্ত যেখানে ১২ মাসের মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল ৩.৪%, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩.৭%-এ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। এর প্রভাবে পেট্রোলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতি পূর্বাভাস ছাড়িয়ে গেছে। আসন্ন নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিই প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে।
মুদ্রাস্ফীতি হলো এমন একটি হার, যার মাধ্যমে সময়ের সাথে সাথে কোনো পণ্য বা সেবার দাম বাড়ার বিষয়টি পরিমাপ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ—একটি বোতলজাত দুধের দাম যদি ১ ডলার হয় এবং এক বছর পর তা বেড়ে ১.১০ ডলার হয়, তবে বোতলজাত দুধের বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতি হবে ১০%।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিস্টিকস (বিএলএস) কনজুমার প্রাইস ইনডেক্স বা ভোক্তা মূল্য সূচক (সিপিআই)-এর মাধ্যমে এটি পরিমাপ করে থাকে। মুদিপণ্য, পোশাক, জ্বালানি থেকে শুরু করে চিকিৎসাসেবাসহ শত শত পণ্যের দামের পরিবর্তন তারা ট্র্যাক করে। মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও খরচের ওপর ভিত্তি করে এই 'ঝুড়ি' বা পণ্যের তালিকা সময়ে সময়ে আপডেট করা হয়।
মুদ্রাস্ফীতির কারণ কী?
মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ কাজ করে। কোনো পণ্যের জোগান বা সরবরাহের চেয়ে যদি চাহিদা বেশি থাকে, তবে উৎপাদকরা দাম বাড়িয়ে দেয়। সম্প্রতি 'লাবুবু' পুতুলের ক্রেজ এবং এর চড়া দাম এর একটি দারুণ উদাহরণ। এছাড়া মানুষের আয় বাড়লেও পণ্যের চাহিদা ও দাম বৃদ্ধি পায়।
চাহিদা অপরিবর্তিত থাকার পরও যদি কোনো পণ্যের জোগান কমে যায়, তবে দাম বেড়ে যায়। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো অপরিশোধিত তেল, যা থেকে পেট্রোল ও ডিজেল তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ৭০ ডলারের একটু বেশি ছিল। কিন্তু সংঘাতের কারণে জোগান কমে যাওয়ায় দাম দ্রুত বেড়ে বর্তমানে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
মার্কিন শুল্কনীতি কীভাবে মুদ্রাস্ফীতিকে প্রভাবিত করছে?
দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার অধিকাংশ প্রধান বাণিজ্য অংশীদার দেশের পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করেছেন। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর কিছু শুল্ক বাতিল করা হলেও, প্রেসিডেন্ট তাৎক্ষণিক ভাবে সেগুলোর পরিবর্তে নতুন ১০% বৈশ্বিক শুল্ক ঘোষণা করেন।
নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের গবেষণা অনুযায়ী, এই অতিরিক্ত আমদানি শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতি বেড়েছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো আমদানিকৃত পণ্যের ওপর যে শুল্ক দেয়, তার প্রায় ৯০% খরচই শেষ পর্যন্ত মার্কিন ভিত্তিক কোম্পানিগুলোকে বহন করতে হয়।
পরোক্ষভাবে, এই উচ্চ শুল্ক স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যের দামেও প্রভাব ফেলেছে, কারণ অনেক মার্কিন উৎপাদক কেই বিদেশ থেকে কাঁচামাল বা যন্ত্রাংশ আমদানি করতে হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, গড় শুল্ক প্রতি এক শতাংশ বাড়লে এক বছরের মধ্যে ভোগ্যপণ্যের দাম প্রায় ০.২৫% বেড়ে যায়।যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের লক্ষ্যমাত্রা ২% হলেও বর্তমান মুদ্রাস্ফীতি এর চেয়ে ওপরে রয়েছে। তবে বিগত বছরগুলোতে পরিস্থিতি এর চেয়েও খারাপ ছিল।
কোভিড মহামারীর সময় সরবরাহ চেইন ব্যাহত হওয়ায় মুদ্রাস্ফীতি দ্রুত বাড়তে শুরু করে। এছাড়া ২০২২ সালের শুরুতে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের সময় তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। এই দুটি প্রধান কারণে সে সময় মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ৯%-এর শিখরে গিয়ে পৌঁছায়।একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার গতি ধীর হওয়ার অর্থ এই নয় যে পণ্যের দাম কমে গেছে; এর অর্থ হলো দাম বৃদ্ধির গতিটি কেবল কিছুটা শ্লথ হয়েছে।
অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য সামান্য মুদ্রাস্ফীতি ভালো বলে মনে করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সাধারণত ২% বা তার কাছাকাছি মুদ্রাস্ফীতিকে আদর্শ মনে করে, যা মানুষের কেনাকাটার সিদ্ধান্তে বড় কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না। এর চেয়ে মুদ্রাস্ফীতি অনেক বেশি কমে গেলে মানুষ দাম আরও কমার আশায় কেনাকাটা স্থগিত রাখতে পারে, যার ফলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো মজুরি বা কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়। সূত্র: বিবিসি