ই-পেপার

জার্মানিতে রাজ্য নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী এএফডির ঐতিহাসিক জয়

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির কোনো রাজ্যে

আপডেট: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১:৩২
৫৩ ভিউ
জার্মানিতে রাজ্য নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী এএফডির ঐতিহাসিক জয়

ছবি সংগৃহীত: ফাইল ছবি

অনলাইন ডেস্ক : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির কোনো রাজ্যে ক্ষমতার সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছে ঐতিহাসিক জয় পেয়েছে কট্টরডানপন্থী দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি)। পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনে প্রাথমিক ফল অনুযায়ী এএফডি ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়েছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে মার্কিন বার্তাসংস্থা সিএনএন।

এই জয়ের মধ্য দিয়ে ৮৩ আসনের রাজ্য পার্লামেন্টে এএফডি পেয়েছে ৩৯টি আসন। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ছিল ৪২টি আসন। ফলে সরকার গঠনের জন্য দলটিকে জোট করতে হবে অথবা সংখ্যালঘু সরকার গঠনের পথে যেতে হবে।

নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর এএফডির নেতারা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। দলের প্রধান প্রার্থী উলরিশ জিগমুন্ড বলেন, ‘এটি আমাদের সুন্দর অঞ্চলের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। মানুষ খুব স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে তারা রাজনৈতিক পরিবর্তন চায় এবং সেই পরিবর্তন আমাদের সঙ্গে চায়।’

এএফডির জয়ের পথ অবশ্য সহজ ছিল না। নির্বাচনের আগে দলটি এগিয়ে থাকলেও জার্মানিতে রাজ্য পর্যায়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিরল। দলটির সম্ভাব্য জোটসঙ্গী হতে পারে বামপন্থী সাহরা ওয়াগেনকনেখট অ্যালায়েন্স (বিএসডব্লিউ), যারা ৫ শতাংশের প্রয়োজনীয় সীমা পেরিয়ে রাজ্য পার্লামেন্টে প্রবেশ করেছে। তবে জিগমুন্ড জানিয়েছেন, বিএসডব্লিউর সঙ্গে জোট করার আগ্রহ তাদের নেই।

জার্মানির মূলধারার সব দলই এএফডির সঙ্গে জোট বা সহযোগিতার সম্ভাবনা নাকচ করেছে। এএফডিকে দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা ‘উগ্রপন্থী’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। দলটির অভিবাসন ও মুসলিমবিরোধী বক্তব্যের কারণে মূলধারার দলগুলো তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক সহযোগিতা না করার যে নীতি অনুসরণ করে আসছে, সেটিই ‘ফায়ারওয়াল’ নামে পরিচিত।

এএফডির সহ-নেত্রী অ্যালিস ওয়াইডেল এই নীতিকে ‘গভীরভাবে অগণতান্ত্রিক’ বলে সমালোচনা করেছেন। নির্বাচনের পর তিনি বলেন, জার্মানরা এমন নীতিতে বিরক্ত, যা তাদের দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। এএফডি জার্মানির স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য নির্বাচনে অংশ নিয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

অভিবাসনবিরোধী ‘রিমিগ্রেশন’ বা বিদেশিদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর নীতিকে নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম প্রধান ইস্যু করেছিল এএফডি। একই সঙ্গে দলটি রাশিয়াপন্থী অবস্থানের জন্যও পরিচিত। অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, স্কুল ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে আরও ঐতিহ্যগত মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে দলটি।

এএফডির নির্বাচনী সাফল্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি তার ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে নির্বাচনের বুথফেরত জরিপের একটি ছবি পোস্ট করেন। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী কিরিল দিমিত্রিয়েভও ট্রাম্পের পোস্ট পুনঃপ্রকাশ করে এএফডির জয়কে জার্মানির ক্ষমতাসীন জোটের জন্য ‘অপমানজনক’ বলে মন্তব্য করেন।

এদিকে স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফল জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজ্যটিতে মের্ৎসের দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ) তাদের আগের ভোটের প্রায় অর্ধেক হারিয়েছে। রাজ্যের বর্তমান সিডিইউ মন্ত্রী সভেন শুলৎস বলেন, ফলাফল জনগণের পক্ষ থেকে একটি ‘স্পষ্ট বার্তা’ এবং এই বার্তাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

এএফডির সহ-নেত্রী ওয়াইডেল এই সুযোগে মের্ৎস ও সিডিইউর তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার দাবি, মের্ৎসকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে এবং বড়দিনের আগেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।

তবে রাজ্য নির্বাচনের মাধ্যমে এএফডির জাতীয় নীতির সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। পররাষ্ট্রনীতি ও অভিবাসন-সংক্রান্ত বড় সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় সরকারের এখতিয়ার। বিশ্লেষকদের মতে, স্যাক্সনি-আনহাল্টে সরকার গঠনের সুযোগ পেলে এএফডি বরং সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং স্থানীয় পুলিশিংয়ের মতো রাজ্য সরকারের আওতাভুক্ত বিষয়গুলোতে বেশি গুরুত্ব দিতে পারে।

রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পক্ষপাতী এএফডি ইউক্রেনকে আরও সামরিক ও আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিরোধিতা করে আসছে। দলটির নেতারা প্রায়ই মস্কো, সেন্ট পিটার্সবার্গ ও রাশিয়ার দখলে থাকা ক্রিমিয়া সফর করেছেন। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সহায়তার অর্থ জার্মান জনগণের জন্য ব্যয় না হওয়ার বিষয়টিও তারা প্রচারে তুলে ধরে।

এএফডির নেতারা ইউক্রেনীয় ও মুসলিম বাসিন্দাদের নিয়েও বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন এবং যাদের দেশ ছাড়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তাদের ফেরত পাঠানোর কথা বলেছেন।

নির্বাচনের পর ওয়াইডেল জাতীয় নির্বাচনে এএফডি ক্ষমতায় এলে দলের উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথাও তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং যাদের দেশ ছাড়ার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে তাদের বহিষ্কার করবে এএফডি।

স্যাক্সনি-আনহাল্টের এই ফল তাই শুধু একটি রাজ্য নির্বাচনের ফল নয়; জার্মানির রাজনীতিতে এএফডির ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা এবং দেশটির প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে।