ই-পেপার

বর্ণবাদের ছক ভেঙে ‘মিস গ্রেট ব্রিটেন’ ফাইনালিস্ট বাংলাদেশি তানিশা

তানিশা জামানের জন্য মিস গ্রেট ব্রিটেন লন্ডনের

আপডেট: ২৫ জুলাই ২০২৬, ২২:৩১
৭ ভিউ
বর্ণবাদের ছক ভেঙে ‘মিস গ্রেট ব্রিটেন’ ফাইনালিস্ট বাংলাদেশি তানিশা

ছবি সংগৃহীত: ফাইল ছবি

বিনোদন ডেস্ক : তানিশা জামানের জন্য মিস গ্রেট ব্রিটেন লন্ডনের একমাত্র প্রকাশ্য ব্রিটিশ-বাংলাদেশি ও মুসলিম ফাইনালিস্ট হওয়াটা কেবল বিজয়ের মুকুট অর্জনের প্রতিযোগিতা নয়; এর চেয়েও বড় কিছু।২০ বছর বয়সী এই তরুণ সমাজকর্মী প্রতিযোগিতাটিকে প্রচলিত সৌন্দর্যের মানদণ্ডগুলোকে চ্যালেঞ্জ করা, তরুণীদের নিজেদের নিজস্বতা উদ্‌যাপনে উৎসাহিত করা এবং সঠিক প্রতিনিধিত্ব কীভাবে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে পারে তা প্রমাণ করার একটি সুযোগ হিসেবে দেখছেন।

ইস্টার্ন আই-এর সাথে কথা বলার সময়, তানিশা শৈশবে প্রচলিত সৌন্দর্যের ধারণায় খাপ খাইয়ে না নেওয়ার অভিজ্ঞতা, পরিবর্তনের মঞ্চ হিসেবে সৌন্দর্য প্রতিযোগিতাকে বেছে নেওয়ার কারণ এবং প্রতিযোগিতার গণ্ডি ছাড়িয়ে তিনি কী বার্তা রেখে যেতে চান, তা নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন।

তানিশা স্বীকার করেন, তিনি কখনোই ভাবেননি যে একদিন তিনি বিউটি পেজেন্টের মতো কোনো মঞ্চে দাঁড়াবেন। পূর্ব লন্ডনে বেড়ে ওঠার দিনগুলোতে তিনি প্রায়শই নিজেকে দুটি আলাদা সংস্কৃতির মাঝে আটকে পড়া এক মানুষ বলে মনে করতেন। তার মনে পড়ে, ব্রিটিশ-বাংলাদেশি সমাজ এবং মূলধারার ব্রিটিশ সমাজ—উভয়ক্ষেত্রেই সৌন্দর্যের প্রচলিত মানদণ্ডের তুলনায় তাকে "বেশি কালো", "বেশি লম্বা" এবং "বেশি চওড়া" বলে মনে করা হতো।

"বাংলাদেশি সমাজেই হোক কিংবা ব্রিটিশ সমাজে—আমাকে কখনোই 'সুন্দর' হিসেবে গণ্য করা হয়নি," বলেন তিনি।

মিস গ্রেট ব্রিটেন লন্ডনের ফাইনালিস্ট হতে পারা তাই তার জন্য এক গভীর ব্যক্তিগত মাইলফলক।"যে প্রতিযোগিতাটি মূলতঃ রূপের প্রতিযোগিতা, সেখানে এত দূর আসতে পারাটা আট বছরের তানিশার মনের গভীর কোনো ক্ষতকে শান্ত করে দেয়।"

প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তটি তৈরি হয়েছিল তানিশার মেন্টরিং করা তরুণীদের দেখে। নিজের সংস্থা 'তানিশাস ট্যালেন্ট'-এর মাধ্যমে তিনি পুরো লন্ডন জুড়ে কর্মজীবী পরিবার ও দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত মেয়েদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি, জনসমক্ষে কথা বলা এবং নেতৃত্বের দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করেন।

তিনি লক্ষ্য করেন, এই তরুণীদের অনেকেই শৈশবে তার অভিজ্ঞতা করা একই রকম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। একই সাথে তিনি বুঝতে পারেন, তাদের নিজস্ব সামাজিক প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতাকে তুলে ধরার মতো কোনো পাবলিক রোল মডেল আশেপাশে নেই।"তাই আমি ভাবলাম, আমাকেই সামনে আসতে হবে এবং তাদের জন্য সেই রোল মডেল হতে হবে। কারণ আমি যদি না করি, তবে আর কে করবে জানি না," বলেন তিনি।

তরুণীদের সাথে তার আলোচনাগুলোতে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি নারীদের সামনে আসা পরস্পরবিরোধী প্রত্যাশার বিষয়টিও উঠে এসেছে। একদিকে তাদের পড়াশোনায় ভালো করতে উৎসাহিত করা হলেও, অন্যদিকে বেশি 'উচ্চাকাঙ্ক্ষী' বা 'বুদ্ধিমতী' না হওয়ার জন্য সতর্ক করা হয়—যাতে তাদের বিয়ের বাজারে কোনো সমস্যা না হয়।

তানিশা জানান, নিজের কাছের মানুষদের কাছ থেকেও তিনি এ ধরনের কথা শুনেছেন এবং তার বিশ্বাস, এটি আজও নারীদের তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জনে বাধা সৃষ্টি করে।‘‘আপনি যা-ই করেন না কেন, আপনিই আপনার জায়গায় সেরা; আর সারাজীবনে আপনি সবাইকে খুশি করতে পারবেন না," তরুণীদের প্রতি তার বার্তা, যেন তারা অন্যদের প্রত্যাশার মাপে নিজেদের মান বিচার করা বন্ধ করে।

যদিও বিউটি পেজেন্টগুলোকে কেবল বাহ্যিক রূপের ওপর বেশি জোর দেওয়ার জন্য প্রায়ই সমালোচনা করা হয়, তানিশা বিশ্বাস করেন এগুলো দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের মাধ্যমও হতে পারে।প্রতিযোগিতার সুইমওয়্যার (সাঁতারের পোশাক) পর্বে তিনি 'বুর্কিনি' পরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার মতে, কতটুকু ত্বক দেখা যাচ্ছে তা দিয়ে কখনো সৌন্দর্য নির্ধারণ করা উচিত নয়। বরং তিনি আশা করেন, বিচারক ও দর্শকরা তাদের ভেতরকার দয়া, আত্মবিশ্বাস ও চরিত্রের মতো গুণগুলোকে মূল্যায়ন করবেন।

"সৌন্দর্য অনেক রূপ ও চেহারায় আসতে পারে। আপনার একটি সুন্দর মুখ থাকতে পারে, ঠিক তেমনি একটি সুন্দর মন ও সুন্দর আত্মাও থাকতে পারে," বলেন তিনি।তানিশা ব্রিটিশ-বাংলাদেশি মুসলিম নারীদের সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাগুলোকেও চ্যালেঞ্জ করতে চান। তার মতে, অনেক উচ্চাকাঙ্ক্ষী নারী প্রকাশ্যে কথা বলতে উৎসাহিত না হওয়ায় তারা অলক্ষ্যে থেকে যান।

"ঠিক আমার মতো এমন অনেক মানুষ আছেন। কিন্তু তাদের এত কম দেখা যাওয়ার মূল কারণ হলো, তাদের আমার মতো এত সোচ্চার হওয়ার সুযোগ বা অনুমতি দেওয়া হয় না।"তার এই বার্তা সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যা তরুণদের আত্মধারণা তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখছে বলে তিনি মনে করেন। অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো অনুপ্রেরণা দিতে পারলেও, অতিরিক্ত ফিল্টার করা ছবি, কসমেটিক সার্জারি এবং কৃত্রিম জীবনধারা তরুণদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিচ্ছে।

আমি ঠিক যেমন, নিজেকে ঠিক সেভাবেই তুলে ধরতে চাই," তিনি ব্যাখ্যা করেন কেন তিনি আজকাল ভারী মেকআপ ছাড়াই নিজের ছবি ও ভিডিও শেয়ার করেন। আলাপের শেষের দিকে তিনি সৌন্দর্যকে একটি মাত্র শব্দে সংজ্ঞায়িত করেন—"স্বকীয়তা"।

মিস গ্রেট ব্রিটেন জয় করা তানিশার একমাত্র বা শেষ লক্ষ্য নয়।তিনি তার রাজনৈতিক কার্যক্রম আরও বাড়াতে চান, তরুণদের নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সাথে কাজ করতে চান এবং ব্রিটিশ-বাংলাদেশি সমাজে সমঅধিকারের জন্য প্রচারণা চালিয়ে যেতে চান। এছাড়া, সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতা পেছনে ফেলে আরও বেশি নারীকে রাজনীতি, নেতৃত্ব ও জনসেবামূলক ক্যারিয়ারে দেখতে চান তিনি।রাজনৈতিক সংবাদ বিশ্লেষণ

"আমি আরও অনেক ব্রিটিশ-বাংলাদেশি নারীকে সোচ্চার হতে, ইনফ্লুয়েন্সার হতে, রাজনীতিবিদ হতে কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় দেখতে চাই—তারা যেন নিজেদের সীমাবদ্ধ না রাখেন। আমি এমন একজন রোল মডেল হতে চাই যেন তারা বলতে পারে, 'তানিশা যদি পেরে থাকে, তবে আমিও পারব।'

তানিশার কাছে মিস গ্রেট ব্রিটেন শুধুই একটি পেজেন্ট মঞ্চে প্রতিনিধিত্বের বিষয় নয়। এটি এমন এক নতুন প্রজন্ম তৈরি করার চেষ্টা, যেন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তরুণীরা বড় হয়ে বিশ্বাস করতে পারে যে—কাউকে নিজের পরিচয় বা রূপ বদলাতে হয় না স্বীকৃতি, সম্মান কিংবা ভালোবাসা পাওয়ার জন্য।