ই-পেপার

নেপাল ট্র্যাজিডি: শিক্ষকের তড়িৎ সিদ্ধান্তে প্রাণে বাঁচলো ১৬৪৩ শিশু

নেপালে আকস্মিক ভয়াবহ বন্যায় যখন মুহূর্তের মধ্যে

আপডেট: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩১
৫ ভিউ
নেপাল ট্র্যাজিডি: শিক্ষকের তড়িৎ সিদ্ধান্তে প্রাণে বাঁচলো ১৬৪৩ শিশু

ছবি সংগৃহীত: ফাইল ছবি

অনলাইন ডেস্ক : নেপালে আকস্মিক ভয়াবহ বন্যায় যখন মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি, সেতু ও স্থাপনা, তখন এক শিক্ষকের মাত্র কয়েক মিনিটের সিদ্ধান্ত বাঁচিয়ে দিলো ১ হাজার ৬৪৩ শিশুর প্রাণ। নুয়াকোট জেলার ত্রিভুবন ত্রিশুলি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদির দ্রুত পদক্ষেপে বড় ধরনের প্রাণহানি থেকে রক্ষা পেলো স্কুলের শিক্ষর্থীরা।

ঘটনার দিন সকালেও পরিস্থিতি ছিল স্বাভাবিক। নদীর তীর থেকে প্রায় ৬০ মিটার উঁচুতে থাকা তিনতলা কংক্রিটের স্কুল ভবনটিকে নিরাপদই মনে করেছিলেন ৪৭ বছর বয়সী দাওয়াদি। কিন্তু সকাল ৯টা ২০ মিনিটের দিকে এক বন্ধুর ফোনে বদলে যায় পরিস্থিতি।

ফোনে ওই বন্ধু জানান, কাছের একটি গ্রাম প্রবল নদীর স্রোতে ভেসে গেছে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি।

প্রথমে স্কুলটি নিরাপদ মনে হলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই এক অভিভাবক ছুটে এসে জানান, নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। এরপর আর কোনো ঝুঁকি নেননি প্রধান শিক্ষক। সঙ্গে সঙ্গে স্কুলের ঘণ্টা বাজিয়ে শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষ খালি করার নির্দেশ দেন। শিশুদের দ্রুত উঁচু ও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি স্কুলবাসের চালকদেরও বাস ফিরিয়ে নিতে বলেন।

তবে একটি বাসের চালকের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ততক্ষণে সেটি সেতু পার হয়ে গিয়েছিল।

এরপর শুরু হয় জীবন বাঁচানোর দৌড়। শিক্ষার্থীরা দলবদ্ধভাবে উঁচু এলাকার দিকে ছুটতে থাকে। আতঙ্কে এক ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে মোটরবাইকে করে পাহাড়ের দিকে নেওয়া হয়। অন্যরা পায়ে হেঁটেই নিরাপদ স্থানে পৌঁছানোর চেষ্টা করে। তাদের পেছনে দৌঁড়াতে থাকেন প্রধান শিক্ষক দাওয়াদিও।

শিশুদের সরিয়ে নেওয়ার কিছুক্ষণ পরই এলাকায় আছড়ে পড়ে ভয়াবহ বন্যার স্রোত। কাদা, পাথর, বরফ ও ধ্বংসাবশেষের স্রোতে একের পর এক ভবন, সেতু ও স্থাপনা ধ্বংস হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত স্কুল ভবনটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তবে তার আগেই স্কুলের ১ হাজার ৬৪৩ শিক্ষার্থীকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। প্রাণে বেঁচে যান বিদ্যালয়ের অধিকাংশ কর্মীও।

তবে এই দুর্যোগে স্কুলের দুই কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। ৩২ বছর বয়সী সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক সান্তোস পারিয়ার নদীর কাছে ভাড়া বাসায় খাবার রান্না করতে ফিরে গিয়ে স্রোতে ভেসে যান। বিদ্যালয়ের দারোয়ান সুলতান লামাও স্কুলের দরজা বন্ধ করতে গিয়ে নিখোঁজ হন।

নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছাকাছি লাংতাং লিরুং শৃঙ্গ থেকে বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথর ধসে পড়ার পর এই আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। ধসের বিশাল স্তূপ লেন্দে খোলা নদীর ওপরের দিকে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে আছড়ে পড়লে নদীর পানির প্রবাহ ভয়াবহ রূপ নেয়।

এই দুর্যোগে নেপাল ও তিব্বতে ব্যাপক প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। নেপালে ৭৬৮ জনের মৃত্যুর খবর এবং ২ হাজার ৫০০ জনের বেশি নিখোঁজ থাকার কথা বলা হয়েছে। চীনের পক্ষ থেকে তিব্বতে ১৬ জনের মৃত্যু ও ৫৪৬ জন নিখোঁজের তথ্য জানানো হয়েছে।

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও। একটি প্রকল্পের টানেলের ভেতরে শতাধিক শ্রমিক আটকা পড়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাদের উদ্ধারে অভিযান চলছে। নেপালি সেনাবাহিনী ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেলে পাইপের মাধ্যমে বাতাস পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে।

ভয়াবহ সেই মুহূর্তে প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদির কয়েক মিনিটের তড়িৎ সিদ্ধান্তই তাই হয়ে উঠেছে ১ হাজার ৬৪৩ শিশুর জীবনের রক্ষাকবচ।

সূত্র: এনডিটিভি