Home আন্তর্জাতিক রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে জাতিসংঘে যেভাবে বদলে গেল যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে জাতিসংঘে যেভাবে বদলে গেল যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য

অনলাইন ডেস্ক : রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় মিত্র ছিল যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধের এই তিন বছরে ইউক্রেনকে অবিচলভাবে সমর্থন দিয়েছে দেশটি; কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে কিয়েভ নিয়ে অবস্থান বদলাতে শুরু করে ওয়াশিংটন।

গত সোমবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে (ইউএনজিএ) ইউক্রেন যুদ্ধের তিন বছর পূর্তির দিন উত্থাপিত একটি প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইউক্রেন ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিল। এতে ইউক্রেনে হামলা চালানোয় রাশিয়ার নিন্দা করা হয়।

ইউএনজিএতে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে একই দিন আলাদা করে যুক্তরাষ্ট্রও একটি প্রস্তাব উত্থাপন করে। প্রস্তাবে সংঘাতের জন্য স্পষ্ট করে রাশিয়াকে দায়ী করা হয়নি।

অন্যদিকে নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে যুদ্ধের ইতি টানার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে।
ইউএনজিএতে উত্থাপিত এই দুই প্রস্তাব থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে বাড়তে থাকা দূরত্বের চিত্র ফুটে উঠেছে। একইসঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অধীন কিয়েভ নিয়ে ওয়াশিংটনের নীতির পরিবর্তন স্পষ্ট হয়েছে।

জাতিসংঘে প্রস্তাব নিয়ে কী ঘটেছিল

গত সোমবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে উত্থাপিত ইউক্রেন ও তার মিত্রদের প্রস্তাবটির শিরোনাম ছিল ‘অ্যাডভান্সিং আ কম্প্রিহেনসিভ, জাস্ট অ্যান্ড লাস্টিং পিস ইন ইউক্রেন (ইউক্রেনে একটি সমন্বিত, ন্যায়সংগত ও স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে অগ্রসর হওয়া)। যুক্তরাষ্ট্রসহ ১৮টি দেশ প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা করা এই প্রস্তাবে স্পষ্ট করে বলা হয়, কিয়েভ নয়, মস্কোই চলমান যুদ্ধ শুরু করেছিল ২০২২ সালে। এতে ইউক্রেনের ‘সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা, ঐক্য ও ভূখণ্ডের অখণ্ডতা’র পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করতে জাতিসংঘের সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

এতে অবৈধভাবে ভূখণ্ড দখলে নেওয়া বা বলপ্রয়োগের হুমকির বিরুদ্ধে ইউএনজিএর সদস্যদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করতে আহ্বান জানানো হয়েছে। সংঘাতে জড়িত উভয় পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে এবং সাধারণ মানুষ- ‘বিশেষ করে নারী ও শিশু’র সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আহ্বান জানানো হয়েছে।

কিয়েভের ইউরোপীয় মিত্রদের উত্থাপিত এই প্রস্তাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, ইউক্রেন থেকে অবিলম্বে রুশ সেনাদের ফিরিয়ে নেওয়া এবং যুদ্ধের সমাপ্তি টানা।
যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পাশাপাশি আরও যেসব দেশ প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেছে, সেগুলোর মধ্যে ইসরায়েল, উত্তর কোরিয়া ও হাঙ্গেরি অন্যতম।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে কী ছিল

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের উত্থাপিত প্রস্তাবের শিরোনাম ছিল ‘দ্য পাথ টু পিস’। এতে রাশিয়া ও ইউক্রেনে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু যুদ্ধ শুরু করা নিয়ে কোনো দেশকে দায়ী করা হয়নি।

প্রস্তাবে ‘রুশ প্রজাতন্ত্র–ইউক্রেন যুদ্ধে প্রাণহানির ঘটনা’য় শোক প্রকাশ করা হয়। এতে জোর দিয়ে বলা হয়, জাতিসংঘের উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষা এবং ‘শান্তিপূর্ণভাবে বিরোধের মীমাংসা’।

তবে প্রস্তাবের খসড়ায় কিছু সংশোধনী এনেছিল ফ্রান্স। তাদের সংশোধনীতে রাশিয়া পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ শুরু করেছিল বলে উল্লেখ করা হয় এবং ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডের অখণ্ডতার কথা বলা হয়।

ফ্রান্সের সংশোধনীর পর প্রস্তাবটি ইউএনজিএতে পাস হয়। এতে পক্ষে ভোট পড়ে ৯৩টি। বিপক্ষে পড়ে ৮টি। ভোটদানে বিরত থাকে ৭৩টি দেশ। যুক্তরাষ্ট্রও প্রস্তাবটিতে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকে।

পরে নিজেদের মূল প্রস্তাবটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে (ইউএনএসসি) নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে এটি ১০–০ ভোটে পাস হয়। পাঁচটি দেশ ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকে। দেশগুলো হলো যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, গ্রিস ও স্লোভেনিয়া।

নিরাপত্তা পরিষদে পাস হওয়া প্রস্তাব মানতে দেশগুলো আইনত বাধ্য; কিন্তু সাধারণ পরিষদের পাস হওয়া প্রস্তাবের ক্ষেত্রে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে এখানে বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়। কোনো সংঘাতকে বিশ্ব কীভাবে দেখছে, ইউএনজিএর প্রস্তাব মাঝেমধ্যে তা প্রভাবিত করে।

যুক্তরাষ্ট্রের আগের অবস্থানের সঙ্গে পার্থক্য কোথায়

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এর আগে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে উত্থাপিত ছয়টি প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গত সোমবার পাস হওয়া দুটি প্রস্তাবও ছিল আগেরগুলোর মতোই।

রাশিয়া নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হওয়ায় সেখানে উত্থাপিত প্রস্তাবের বিপক্ষে দেশটির ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। স্থায়ী সদস্যদের কেউ ভেটো দিলে নিরাপত্তা পরিষদে কোনো প্রস্তাব পাস হয় না। সে কারণে ইউক্রেনের পক্ষে প্রস্তাব পাসের জন্য সাধারণ পরিষদ গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পরিণত হয়েছিল।

Exit mobile version