অনলাইন ডেস্ক : রাজধানীর কলাবাগানে মাস্টারমাইন্ড স্কুলের ‘ও’ লেভেলের ছাত্রী আনুশকা নুর আমিনকে (১৭) ধর্ষণের পর হত্যার মামলায় গ্রেপ্তার ফারদিন ইফতেখার দিহান আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। গত শুক্রবার ঢাকা মহানগর হাকিম মামুনুর রশীদ দিহানের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড শেষে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এদিকে ‘ভ্যাজাইনাল’ এবং ‘রেক্টাম’ দিয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে আনুশকার মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন তার মরদেহের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক। এছাড়া তার শরীরে আর কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
আনুশকার মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবারের পক্ষ থেকে রাজধানীর কলাবাগান থানায় ধর্ষণের পর হত্যামামলা করা হয়েছে। ওই মামলায় গ্রেপ্তার ফারদিন ইফতেখার দিহান (১৮) গতকাল দুপুরে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন বিচারক। এ মামলায় পুলিশকে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৬ জানুয়ারি দিন ধার্য করে আদালত। পুলিশের পক্ষ থেকে আসামি দিহানকে রিমান্ডের আবেদনের প্রস্তুতি নেওয়াহলেও সে স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দিতে রাজি হওয়ায় তা রেকর্ড করার আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা।
আনুশকার স্বজনরা অভিযোগ করেন, ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ধর্ষণ করেই মেরে ফেলা হয়েছে আনুশকাকে। দোষীর সর্বোচ্চ সাজার দাবি জানান তারা।
এক ভাই দুই বোনের মধ্যে সবার বড় আনুশকা। মাস্টারমাইন্ড স্কুলে ইংরেজি বিভাগের ‘ও’ লেভেলের শিক্ষার্থী ছিল সে। তাদের গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার গোপালপুর। তার মা শাহানুরী ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের কম্পিউটার অপারেটর। আর বাবা আল-আমিন আহমেদ নবাবপুরের ব্যবসায়ী।
গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে আনুশকার লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়। দুপুর ১টার দিকে মৃতদেহের ময়নাতদন্ত করেন ফরেসনিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ। ময়নাতদন্ত শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘ময়নাতদন্তকালে আমরা দেখতে পাই তার প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। আর সেটি হয়েছে মূলত তার ‘ভ্যাজাইনাল’ এবং ‘রেক্টাম’ রক্তক্ষরণ। দুইভাবে রক্তক্ষরণের ফলেই তার মৃত্যু হয়েছে। এটা আপাতদৃষ্টিতে বিকৃত যৌনাচার মনে হয়েছে। তার শরীরে আর কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তাকে চেতনানাশক কোনো কিছু খাওয়ানো হয়েছিল কি না সে জন্য নমুনা সংগ্রহ এবং ঘটনাস্থলে একাধিক ব্যক্তি ছিল কি না সেজন্য ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এছাড়া তার ভিসেরা সংগ্রহ করা হয়েছে।’
ধর্ষণ বা বলপ্রয়োগের কোনো চিহ্ন পেয়েছেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. সোহেল বলেন, ‘এখানে জোরজবরদস্তির কোনো আলামত পাইনি। তবে আমরা দুই পথেই কিছু ‘ইনজুরি’ পেয়েছি। সেই ইনজুরিগুলোর জন্যই রক্তক্ষরণ হয়েছে এবং মারা গেছে।’
এটা দল বেঁধে ধর্ষণের ঘটনা কি না এমন প্রশ্নের জবাবে এই চিকিৎসক বলেন, ‘আমরা তার দেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছি। ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের জন্য পাঠিয়েছি। রিপোর্ট এলে এ বিষয়ে বলা যাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘থানা-পুলিশ সুরতহাল রিপোর্টে বয়স জানতে চেয়েছে। সে কারণে মৃতদেহ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের এক্সরে বিভাগে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে এক্সরে করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। এক্সরে ছাড়াই মৃতদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হরেছে। তার শরীরের গঠন ও দাঁত দেখে বয়স নির্ধারণ করা হবে।’
এদিকে কলাবাগান থানায় ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে করা মামলায় একমাত্র আসামি করা হয়েছে আনুশকার কথিত বন্ধু ইফতেখার ফারদিন দিহানকে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের নিউ মার্কেট জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) আবুল হাসান বলেন, ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯-এর ২ ধারায় একটি মামলা করেছেন নিহত কিশোরীর বাবা। মামলায় ইফতেখার ফারদিন দিহানকেই একমাত্র আসামি করা হয়েছে। আমরা বৃহস্পতিবারই তাকে আটক করেছি। এখন তাকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। সে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। ফলে তাকে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে।’
পুলিশ হেফাজতে থাকা দিহানের তিন বন্ধুর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রাথমিকভাবে তাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। পরবর্তী সময়ে তাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে আইনের আওতায় আনা হবে।’
গতকাল ঢামেক মর্গে আনুশকার মা শাহানুরী বলেন, তার মেয়ের বয়স ১৭ বছর। অথচ সুরতহাল রিপোর্টে মেয়ের বয়স পুলিশ ১৯ বছর উল্লেখ করেছে। আসামিপক্ষের প্ররোচনায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার নাবালিকা মেয়েকে সাবালিকা আখ্যায়িত করার চেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ শাহানুরীর। তিনি মেয়ে হত্যার ন্যায়বিচার দাবি করেন।
পুলিশ জানায়, গত বৃহস্পতিবার রাতে আনুশকার বাবা আল আমিন আহম্মেদ বাদী হয়ে দিহানকে আসামি করে কলাবাগান থানায় মামলা করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার সকাল আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে আনুশকার মা কর্মস্থলের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হয়ে যান। এর এক ঘণ্টা পর তার বাবাও ব্যবসায়িক কাজে বাসা থেকে বের হয়ে যান। দুপুর পৌনে ১২টার দিকে আনুশকা মাকে ফোন করে কোচিং থেকে পড়ালেখার পেপার্স আনার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়েছিল। এই মামলার একমাত্র আসামি দিহান দুপুর আনুমানিক ১টা ১৮ মিনিটে ফোন করে আনুশকার মাকে জানায়, আনুশকা তার বাসায় গিয়েছিল। হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়ায় তাকে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়েছে। অফিস থেকে বের হয়ে আনুমানিক দুপুর ১টা ৫২ মিনিটে আনুশকার মা হাসপাতালে পৌঁছেন। হাসপাতালের কর্মচারীদের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, দিহান ৬৩/৪, লেক সার্কাস ডলফিন গলি, পান্থপথ, কলাবাগানের বাসায় আনুশকাকে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করে। প্রচুর রক্তক্ষরণের কারণে অচেতন হয়ে পড়লে বিষয়টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য দিহান নিজেই তাকে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে নিয়ে যায়। খবর পেয়ে কলাবাগান থানা পুলিশের একটি দল হাসপাতালে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
নিহত আনুশকার মামা হারুন অর রশিদ বলেন, দিহান আনুশকাকে ফোন করে ফুসলিয়ে কলাবাগানের ডলফিন গলির বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে তাকে ধর্ষণ করে। একপর্যায়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে অসুস্থ হয়ে পড়লে দিহানই তাকে ধানমন্ডি আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত বলে জানান। পরে দিহান আনুশকার মাকে ফোন করে জানায় যে, আনুশকা তার বাসায় গিয়েছিল, সেখানে সে সেন্সলেস হয়ে পড়েছে। তাকে সে আনোয়ার খান মডার্নে নিয়ে এসেছে। পরে তার মা হাসপাতালে গিয়ে মেয়ের লাশ দেখতে পান।
ডিএমপি রমনা বিভাগের উপকমিশনার সাজ্জাদুর রহমান বলেন, ‘ঘটনার পর সংবাদ পেয়েই তাৎক্ষণিক আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতাল থেকে দিহানকে গ্রেপ্তার করে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সে দাবি করেছে, ঘটনার দিন বাসায় কেউ ছিল না। এ সময় সে আনুশকাকে ফোন করে ডেকে আনে। পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে ও সম্মতিতে তাদের মধ্যে মেলামেশা হয়। মেলামেশার পরে ওভার ব্লিডিং হওয়ার কারণে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে আনুশকা। পরে হাসপাতালে নিলে সে মারা যায়।’
এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘ওই বাসা থেকে বেশকিছু আলামত জব্দ করা হয়েছে। আনুশকার ভেজাইনাল সোয়াব নেওয়া হয়েছে। সেটি দিয়ে প্রমাণ হবে দৈহিক মেলামেশা হয়েছে কি না। আর এর বাইরে অন্য কোনো কেমিক্যাল (মাদক) ব্যবহার করা হয়েছে কি না সেটির জন্য পোস্টমর্টেমে কেমিক্যাল একজামিনেশনের জন্য আলামত রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই ঘটনাকে অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়াতে ভিন্ন খাতে ব্যবহারের চেষ্টা করছে। আমি তাদের বিনীতভাবে বলতে চাই, পরিবার বুঝেশুনে মামলা করেছে। তারপরও যদি এর সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত থাকে তাদের আইনের আওতায় আনার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। এ ঘটনাতে কেউ ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করবেন না।’